‘ঢাকার বায়ুদূষণ কমানোর কোনো দ্রুত ও সহজ সমাধান নেই’

আমাদের বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অনেক বিষয় জড়িত। যেমন যানবাহনের জ্বালানির মানজনিত দূষণের একটি বিষয় আছে। সেখানে আমাদের পরিশোধনাগারগুলোর সক্ষমতার বিষয়ও আছে। এছাড়া

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের নগরাঞ্চলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাকে বেষ্টন করে রাখা নদীগুলোসহ দেশের প্রতিবেশগত সম্পদের বড় একটি অংশ এখন সংকটাপন্নের তালিকায়। দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষায় সরকারের কার্যক্রম নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বদরুল আলম ও আল ফাতাহ মামুন

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ কী?

আমাদের বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ অনেক বিষয় জড়িত। যেমন যানবাহনের জ্বালানির মানজনিত দূষণের একটি বিষয় আছে। সেখানে আমাদের পরিশোধনাগারগুলোর সক্ষমতার বিষয়ও আছে। এছাড়া কিছু শিল্প, ইটভাটা, অনাবৃত বালি পরিবহন, সড়ক বিভাজনের অনাবৃত মাটি ও নির্মাণকাজসংশ্লিষ্ট উৎস থেকে বায়ুদূষণ হয়ে থাকে। ঢাকায় এখন নির্মাণকাজ থেকে বায়ুদূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। সিটি করপোরেশনগুলো পানি ছিটানো শুরু করেছে। আর বাকি যেসব সমস্যার কথা বললাম, সেগুলোর মধ্যে কোনোটির সমাধান কি তিন মাসের মধ্যে দেয়া সম্ভব? পুরনো যানবাহন তুলে দিতে হবে। এর উদ্যোগ নিলেই আমাদের একটি সংখ্যা বলা হয় ১৬ লাখ, আসলে তা মোটেও এত না। পুরনো যানবাহনগুলো তুলতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু এগুলোয় তো মানুষ চলাচল করে। তাদের সামনে একটি বিকল্প রাখতে হবে। পুরনো যানবাহন তুলে নেয়ার বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় একসঙ্গে বাস মালিকদের সঙ্গে সভা করেছে। সভা করে তাদের ছয় মাস সময় দেয়া হয়েছে। এ ছয় মাসের মধ্যে তাদের বিকল্প যানবাহন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্ভাব্য ভূমিকা, ব্যাংক খাত থেকে কী ধরনের সহায়তা দেয়া যেতে পারে—এসব বিষয়ে আমাদের জানাতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ একটি কাজ শুরু হলো।

ইটভাটার প্রভাবে বায়ু বা পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে কোনো কর্মসূচি রয়েছে?

২০২৫ সালের মধ্যে ইটভাটা বন্ধ করে সরকারি সব নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য ইটভাটা বন্ধের কাজ আমরা শুরু করেছি। তাদের বলে দেয়া হয়েছে, নতুন করে আর কোনো ইটভাটার লাইসেন্স দেয়া হবে না। পার্বত্য জেলাগুলোয়ও ইটভাটা চালু না করতে ডিসি মহোদয়দের বলা হয়েছে। প্রথমে আমরা সরকারকে দিয়েই শুরু করব। গৃহায়ন ও গণপূর্ত, স্থানীয় সরকার এবং সড়ক; তিন মন্ত্রণালয়কেই চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, আপনারা বিকল্প ইট ব্যবহারে যান। এটি সরকারি নির্দেশনা। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এরই মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্লকে চলে গেছে। তাহলে এখানেও একটি কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকা শহরের অনাবৃত জায়গাগুলোকে আবৃত করার জন্য সিটি করপোরেশনকে বলা হয়েছে, তারা ব্যবস্থা নেবে। বায়ুদূষণ কমাতে চীনের মতো দেশেরও পাঁচ থেকে সাত বছর লেগেছে। আর আমাদের পরিশোধনাগার ঠিক করতে হবে, পুরনো বাস তুলতে হবে, ইটের বিকল্প আনতে হবে, এগুলো করার পর হয়তো বছর দুয়েকের মধ্যে আর শীর্ষে থাকব না। তবে বায়ুমান মোটামুটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিতে হলে আমি কোনো সহজ সমাধান দেখছি না। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আমিই আদালতে গিয়েছিলাম। আমার পরিবারের সদস্যরা বায়ুদূষণে অসুস্থ হয়ে ভুগছে।

ঢাকা প্রায়ই বায়ুদূষণের শীর্ষে চলে যায়, এর সমাধানে কী ভাবছেন?

পরিবেশ অধিদপ্তরকে বলেছি, ঢাকা যখন বায়ুদূষণে শীর্ষে চলে যায়, তখন যেন একটা সতর্কবার্তা দেয়া হয়, যাতে নাগরিকরা প্রস্তুতি নিয়ে বের হতে পারে। এ জায়গায় নগরবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে বলছি একটু সময় না দিলে এটি পারা যাবে না। শুধু আমরা না, আমাদের পরবর্তী সরকারকেও এসে এ কাজগুলো করতে হবে। কাজের প্রক্রিয়াটা আমরা শুরু করেছি। আগামী পাঁচ বছরের জন্য বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা আমাদের করা হয়েছে। ওই পরিকল্পনা ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তাদের কাজগুলো করবে। কাজগুলো সময়সাপেক্ষ। এছাড়া দেশে বায়ুদূষণের বড় একটি অংশ আসে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে।

এখানে ‘প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে দূষণের’ বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন কি?

প্রতিবেশী দেশের শিল্প-কারখানার দূষিত বাতাসকে তো আপনি আটকাতে পারবেন না। বাতাস এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলেই আসছে। তাদের ওখানে যে কয়লা উত্তোলন হয়, তা আমাদের সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি জায়গায়। এমন অনেক কাজ সীমান্ত এলাকাগুলোয় হয়। সেসব দূষণ আমাদের এখানেও আসছে।

অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়?

বিশ্বব্যাংক চেষ্টা করছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একসঙ্গে বসিয়ে বায়ুদূষণ উন্নয়নের জন্য কিছু কর্মসূচি গ্রহণের।

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আপনাদের পদক্ষেপ কী?

আমরা শব্দদূষণ নিয়েও কাজ শুরু করেছি। প্রথম চেষ্টা করেছি, বিমানবন্দর এলাকা অন্তত শব্দদূষণমুক্ত করা যায় কিনা। বিদেশ থেকে এলে কাস্টমস পার হয়ে গাড়িতে ওঠার পর যেমন অবস্থা হতো, এত হর্নের আওয়াজ আমি পৃথিবীর আর কোথাও দেখিনি। একই জিনিস নেপালেও দেখা যেত। এবার আমি নেপালে গিয়ে দেখেছি, সেখানে কোনো হর্ন নেই। সেখানে একটা আইন হয়েছে, অপ্রয়োজনে হর্ন বাজালে লাইসেন্সে পাঞ্চ করা হয়। প্রতি পাঞ্চে গাড়ির মালিককে গিয়ে টাকা দিয়ে আসতে হয়। ড্রাইভার দিয়ে টাকা পাঠানোর কোনো পদ্ধতি নেই। তিন নম্বর পাঞ্চ হলে সেখানকার সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ওখানে গিয়ে শব্দদূষণ সম্পর্কে ১ ঘণ্টা লেকচার শুনতে হয়। আর পঞ্চম পাঞ্চে লাইসেন্স বাতিল। আমাদের এখানে হর্ন বাজানো একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ হর্ন না বাজিয়েও চলাচল করা যায়। বান্দরবান থেকে আমরা হর্ন না বাজিয়ে এসেছি। খুলনা থেকে হর্ন না বাজিয়ে এসেছি। বগুড়া থেকে হর্ন না বাজিয়ে এসেছি। এটা সম্ভব। আমাদের আইনে হর্ন বাজানো অপরাধ ঘোষণা করা হলেও এটিকে দণ্ডনীয় করেনি। ফলে এখানে আইনের একটা সংশোধনী এনে আবার একটা ক্যাম্পেইন করে তারপর আইনের প্রয়োগে যাব। এখানে একটি অজুহাত প্রায়ই আমাদের দেয়া হয়, রিকশার জন্য হর্ন বাজে। বিমানবন্দরের রাস্তায় তো রিকশা নেই। সেখানে হর্ন বাজানো হয় কেন? সংসদ ভবনের সামনে তো কোনো রিকশা নেই। তাহলে সেখানে হর্ন বাজে কেন? ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় তো বিচিত্র চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে কিন্তু হর্নের সম্পর্ক আছে। মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক আছে। আমরা বিমানবন্দরে হর্ন নিষিদ্ধ করে দেখেছি। অল্পমাত্রায় কমেছে। কমেনি তা নয়। কিন্তু আমরা তো শাস্তি দিতে পারছিলাম না। শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ওদের অনেক ধরনের যুক্তি থাকে। আমি মনে করি এ বিষয়ে দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে অভ্যাসগত পরিবর্তন আনা সম্ভব। যদি আমরা আইনের প্রয়োগটা শুরু করি।

ঢাকার চার নদীকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলোর সুস্থতা নিশ্চিতে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আপনি আগে দেখেছেন আর এখন কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

যখন আদালতে এ-সংক্রান্ত রায় হয়, আমি মামলার একটি পক্ষ ছিলাম। তখন থেকেও যদি কাজ শুরু করা হতো আজ এ পর্যায়ে এসে দাঁড়াত না। ৫৩ বছরেও ঢাকা শহরের পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আমরা এটা তিন মাসে করতে পারব? এ নদীগুলো আর দেখা যায় না। এগুলোকে দেখলে কষ্ট হয়। আমরা দায়িত্ব নিয়ে বলেছি, নদী পরিষ্কারের একটা কর্মসূচি আমরা হাতে নিয়েছি। এখন ঢাকার চার নদী বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যায় যারা দূষণ করে, সে তালিকা আমরা প্রস্তুত করেছি। এখন আমরা চেষ্টা করব, এ নদীগুলোর মধ্যে কোনো একটাকে বেছে নিয়ে অন্তত সেটিকে দূষণমুক্ত করতে পারি কিনা। আর বাকিগুলো নিয়ে আমরা একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা করব। এখন একটা নদী পরিষ্কার করতে যে পরিমাণ টাকা লাগবে, সেটি আমাদের জন্য একটি দুশ্চিন্তার কারণ। এত বছরের জঞ্জাল! ক্রোমিয়াম থেকে শুরু করে কী নেই আমাদের নদীর মধ্যে? আমি এবারো জাপান ও জার্মানির পরিবেশমন্ত্রী এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছি, অন্তত একটা নদী আমরা পরিষ্কার করতে পারি কিনা; সে বিষয়ে। আপনি নদীর পাড়ে সুন্দর ওয়াকওয়ে করে দিলেন। কিন্তু নদী থেকে আসা দুর্গন্ধে মানুষ এই ওয়াকওয়ে ব্যবহার করবে না। এখন এ কর্মপরিকল্পনা হয়ে গেলে এটি আমরা শুরুর ব্যবস্থা করব। আমরা চেষ্টা করব দেশী কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজটি করার। কিন্তু আপনি ক্রোমিয়াম কেমন করে নদীর থেকে সরাবেন? তিন থেকে ছয় মিটার হলো পলিথিন ব্যাগ। এগুলোকে সরিয়ে আপনি রাখবেন কোথায়? এগুলো তো রাতারাতি হয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। আপনি দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে তাকান, লন্ডনের দিকে তাকান, জাপানের দিকে তাকান। তারা কি সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে দুই-তিন বছরে নদী পরিষ্কার করতে পেরেছিল? তারা তা পারেনি। এর জন্য সময় লাগবে। কর্মপরিকল্পনাটাই তো কেউ এখনো করেনি। ফলে আমাদের এখন স্ক্র্যাচ থেকে হাত দিতে হয়েছে। একটা জিনিস আমি বিশ্বাস করি, ঢাকাকে বাঁচাতে হলে ঢাকার জলাশয়কে বাঁচাতে হবে। ঢাকার জলাশয় না বাঁচিয়ে ট্রেন দিয়ে, বাস দিয়ে, গাড়ি দিয়ে ঢাকা বাঁচানো যাবে না। যদি পানি না থাকে ঢাকা বাঁচবে কীভাবে? এখনই তো ঢাকা কারবালা। ঢাকার চারপাশে এতগুলো নদী, কিন্তু আপনি নদী থেকে পানি নিয়ে খেতে পারছেন না। আপনাকে যেতে হচ্ছে পদ্মায়, মেঘনায়। কাজেই আমরা পরিকল্পনাটা চূড়ান্ত করি। অন্তত কাজটা শুরু করে দিয়ে যাই।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অবস্থা নিয়ে আপনার সার্বিক মূল্যায়ন কী?

সেন্ট মার্টিন এমন একটা দ্বীপ, যেখানে কোরালের উপস্থিতি রয়েছে। এটি খুবই সংবেদনশীল একটা এলাকা। একবার নষ্ট হয়ে গেলে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল বলছে, যদি এভাবে সেন্ট মার্টিনের ওপর আমাদের অত্যাচার চলতে থাকে, তাহলে ২০৪৫ সালের মধ্যে সেন্ট মার্টিন আর থাকবে না। দ্বীপটিতে ৮-১০ হাজার স্থানীয়দের বসবাস। এর বাইরে অনেকে গিয়ে সেখানে হোটেল করছে, মোটেল করছে। বারবার বলা হচ্ছে এসব নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ অবৈধ। কেননা এটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এখানে নির্মাণকাজের কোনো অনুমতি সরকার দেয় না। এটি যে কেবল ব্যক্তি করে তা নয়, সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানও তো ফাউন্ডেশন দিয়ে ভবন করে ফেলছে। সেন্ট মার্টিনকে বাঁচানোর কথা কেউ ভাবেনি। কেমন করে সেখানে পর্যটক নিয়ে যাবে, সেটার কথা ভেবেছে। আপনি ব্যাংককে যান, ফিলিপাইনে যান, ইন্দোনেশিয়ায় যান; দেখবেন সেখানে সংবেদনশীল জায়গায় পর্যটন বন্ধ রাখে। ব্যাংককে একটা জনপ্রিয় জায়গা আছে ক্র্যাবে। ওইখানে কিন্তু এখন তিন বছরের জন্য পর্যটন বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের এখানে কিছু একটা নিয়ন্ত্রণ করতে গেলেই জাহাজ মালিক-হোটেল মালিকরা আন্দোলন শুরু করে। এটিকে তারা সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় মানুষের আন্দোলন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। শুধু সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দাদের কথা চিন্তা করে আমরা অতিরিক্ত কড়া নিয়ন্ত্রণে যাইনি। আমরা বলেছি ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতে থাকতে পারবে, কিন্তু প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি মানুষ থাকতে পারবে না। অথচ সব পরিসংখ্যান বলে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০-এর বেশি পর্যটক ধারণ ক্ষমতা সেন্ট মার্টিনের নেই। যে দ্বীপে আট হাজার মানুষ থাকে, সেখানে যদি প্রতিদিন ১০ হাজার বহিরাগত ঢোকে; তাহলে স্থানীয়দের অস্তিত্ব বলে কি আর কিছু থাকে? শুধু যেন স্থানীয়রা আয়-উপার্জন থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্যই ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে আমরা দুই হাজার করে পর্যটক এবার অনুমোদন দিয়েছি। এর আগের সরকারগুলো এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যারা আন্দোলন করবে দেখবেন তাদের একটা ভাষা, ‘ফ্যাসিস্টের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে’। তারা যখন পদ্মা সেতু পার হয় তখন কি বলে এটি ফ্যাসিস্টের সেতু, এটি পার হব না? তা তো বলে না। অর্থাৎ নানাভাবে বিষয়টিকে রাজনৈতিক করার চেষ্টা। আরেকটা চেষ্টা এ রকম ছিল—সেন্ট মার্টিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে নেবে নাকি? এর ব্যাখ্যা বহুবার দেয়া হয়েছে। আপনি এ ব্যাখ্যাটা কাকে দেবেন এবং কেন দেবেন? যুক্তরাষ্ট্র অফিশিয়ালি বলেছে, ‘আমরা এমন কথা বলিনি’। এ ব্যাখ্যা যাদের দেবেন, যারা এ কথাগুলো তোলে, তারা কি কোনো যুক্তিতর্কের ধার ধারে? তাহলে কি তারা এ কথাগুলো তুলত? বিষয়টা হলো, আমাদের প্রথম বাঁচাতে হবে সেন্ট মার্টিনকে এবং এর স্থানীয় বাসিন্দাদের। আমাদের অবশ্যই স্থানীয় বাসিন্দাদের বিকল্প আয়-উপার্জনের কথা ভাবতে হবে। আর সেন্ট মার্টিনে পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ করা হবে না, নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে।

তার মানে আপনি দায়িত্ব গ্রহণের পর সেন্ট মার্টিন নিয়ে বহির্বিশ্ব বা কোনো দেশের আগ্রহের ছিটেফোঁটাও দেখেননি?

তারা কেন এ দ্বীপটা নিয়ে আগ্রহী হবে আমাকে বলুন? এখানে তো আগ্রহের কোনো কারণই নেই। যেমন বলা হয়, ‘সেন্ট মার্টিন দিতে চায়নি বলে সাবেক সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারেনি’। অথচ ক্ষমতায় থাকার জন্য কী-না করা হয়েছিল, সেটি আমাকে বলুন! যে দল ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণের ভোটাধিকারের সঙ্গে ছলচাতুরী করতে পারে, তার সামনে সেন্ট মার্টিনের মতো অতটুকুন দ্বীপ কোনো বিষয় ছিল? এগুলো তো ওই দলের কতগুলো অন্ধ সমর্থক বা সুবিধাভোগীদের মুখে কথা তুলে দেয়ার মতো সস্তা জনপ্রিয় উক্তি। আরেকটা কথা বলি। যুক্তরাষ্ট্র যেসব জায়গায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে, সেগুলোর সঙ্গে সেন্ট মার্টিনের আয়তন, ভূতাwত্ত্বিক অবস্থান, এগুলো বিচার করলেই তো হয়ে যায়। এগুলো তো আপনারাও বহুবার বলেছেন। কিন্তু যারা কথা শুনবে না, যারা জেগে ঘুমায়, তাদের তো আর আমি ওঠাতে পারব না।

বিগত সরকারের সময় উন্নয়নের নামে বনের অনেক ক্ষতি করা হয়েছে। আপনারা আসার পর বন সংরক্ষণ, টেকসই বন ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন?

আমরা কিছু কার্যক্রম শুরু করেছি। কক্সবাজারে সংরক্ষিত বনভূমির ৭০০ একর জায়গা বিসিএস প্রশাসন একাডেমিকে দেয়া হয়েছিল ট্রেনিং একাডেমি করার জন্য। অপূর্ব সুন্দর বন। ওই বরাদ্দ ভূমি মন্ত্রণালয় বাতিল করে দিয়েছে। একইভাবে তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কক্সবাজারের আরো কিছু বনের জায়গা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল, সেগুলো বাতিলের জন্য আমরা চিঠি লিখেছি এবং বাতিলের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কক্সবাজারে সংরক্ষিত বনে বাফুফের প্রশিক্ষণ একাডেমি হবে কেন? বাংলাদেশে আর কোনো জায়গা নেই? কক্সবাজারের জমির ওপর সবার চোখ আছে। সোনাদিয়া দ্বীপের যে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া, সেখানে বন বিভাগ কী যে সুন্দর বনায়ন করেছিল, পুরোটাই উপকূলীয় বন, মানুষকে ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষার বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। হঠাৎ করে সেখানকার ডিসি বন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করে ইকোনমিক জোন অথরিটিকে দিয়ে দিলেন। ইকোনমিক জোন অথরিটিই-বা বনের জায়গা চায় কী করে? সেটা দিয়ে দেয়ার পর দেখলাম জনস্বার্থে একটা মামলা হয়েছে এবং সে মামলায় একটা আদেশ এসেছে ওই লিজটা স্থগিত করার জন্য। আমরাও চিঠি লিখেছি সরকারকে, এটা আপনারা বাতিল করেন। ডিসি যখন বেজাকে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ) দিয়েছে, সেখানে লেখা ছিল না, কী জন্য দেয়া হয়েছে। এভাবে কী একটি পাবলিক প্রপার্টি, যেখানে বন আছে, এক কর্তৃপক্ষ চাইলেই আরেক কর্তৃপক্ষকে দিয়ে দিতে পারে? বন অধিদপ্তরকে জিজ্ঞেস না করে? এটি অনেক বড় কাজ হয়েছে। ওখানে প্রায় ১২ হাজার একর বনভূমি, যদি আমরা আবার বনায়ন করতে পারি তাহলে বনের পরিমাণ বাড়বে।

শালবন ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ?

শালবন নিয়ে হাইকোর্ট একটি আদেশ দিয়েছেন। ৪১ হাজার একর বলেন আর ৪৩ হাজার একরই বলেন, এর সীমানা নির্ধারণ করে ওই বনের মধ্যে গারো সম্প্রদায়ের প্রথাগত বনবাসী যারা আছেন, তাদের অধিকারগুলো সেটল করে বাকিটায় প্রাকৃতিক বন ফিরিয়ে আনা হোক। এ কাজটা আমরা শুরু করেছি। আদালতের রায়ের আলোকে একটা কমিটি হয়েছে, যেখানে গারো সম্প্রদায়ের লোকেরাও আছেন, অন্য যারা আমাদের আদিবাসী তারাও আছেন। ওখানে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ডোর টু ডোর সার্ভে হয়ে গেছে এরই মধ্যে। এটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ দিয়ে ভেরিফাই করিয়ে দেয়া হবে। তারপর যেসব জায়গায় বন বিভাগের এখন সামাজিক বনায়নের নামে ইউক্যালিপটাস অ্যালিকাশি আছে, ওগুলো কেটে ফেলে আমরা শালবন ফিরিয়ে আনব। তারপরের দফায় আমরা মেহগনি, যেগুলো আসলেই শালবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত না; কিন্তু সেগুলো আমাদের বন বিভাগ করেছে, সেগুলোও কেটে ফেলে শালবন ফিরিয়ে আনব। আর বিস্তীর্ণ এলাকা মধুপুর শালবনের যেখানে বনের বাইরের লোকেরা বাণিজ্যিকভাবে কলা ও আনারস চাষ করছে, সেখানে আমরা একটা নিয়ন্ত্রণ আনব। যেটুকু প্রথাগত বনবাসীদের স্বার্থে লাগে, সেটুকু আমরা অবশ্যই ছাড় দেব। আর যেটুকু লাগে না, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত, মধুপুর শালবন তো কলা চাষের জায়গা হতে পারে না। আনারস চাষের জায়গা হতে পারে না। সেখানে আমরা ক্রমান্বয়ে শালে যাব। একটি কথা মনে রাখতে হবে, শালবন ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

উন্নয়ন প্রকল্পের নামে দখল হওয়া বনভূমি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে?

৫ আগস্টের পর ভালুকা ও গাজীপুরে খুবই মূল্যবান ৮৮ একর বনভূমি বেদখল হয়। এটা কারা করেছে আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। এখানে আমরা দখলদারদের উচ্ছেদের কাজ হাতে নিয়েছি। র‍্যাব-সেনাবাহিনী-পুলিশ অনেক সমর্থন দিচ্ছে। এরই মধ্যে ভালুকায় আমরা ২০ একর বন ফিরিয়ে এনেছি। আমাদের পরিকল্পনা হলো আগামী দুই মাসের মধ্যে বাকিটুকুও ফেরত নিয়ে আসা। আমাদের অভিযানে অনেক দখলদার নিজ থেকেই সরে যাচ্ছেন। ধরে নেন, ৫৭০ একর বনভূমি বেদখল আছে। এর মধ্যে বড় অংশই ২০ ধারায় সংরক্ষিত বন। যেটি চূড়ান্তভাবে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা আছে, সেটি আপনি চাইলেও কোনোভাবে ভিন্ন রেকর্ড করতে পারবেন না। এরপর আমরা এগুলো উদ্ধারে কাজ শুরু করব। হয়তো সবটুকু আমরা করে যেতে পারব না। কিন্তু যেটুকু পারব, সেখানেও যেন একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হয়ে যায়। কোনো কোনো জায়গায় দখলদাররা মামলা-মোকদ্দমা করে এমনভাবে জিতে গেছে, সেখান থেকে ব্যাক ট্রাক করানোটা সমস্যা। তবে আমার হাতেও যেহেতু বনের কাগজ আছে, সেখানে আমি মধ্যবর্তী কোনো একটা পন্থা খোঁজার চেষ্টা করব। আমাদের বন উদ্ধারের কার্যক্রম এমন হবে, ভবিষ্যতে যেন কথায় কথায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বন বরাদ্দ দেয়া না যায়।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে উপদেষ্টা হওয়ার আগে ও পরের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।

আগে আমি নালিশ করতাম। আগে বলতাম, দুর্নীতি হচ্ছে, অস্বচ্ছ হচ্ছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক-অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। এখন তো আমি আর নালিশ করতে পারব না। আমার যে অভিযোগগুলো ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে আমাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। যাতে আর দুর্নীতি না হয়, অস্বচ্ছতা না থাকে, সরকারের সিদ্ধান্ত যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক হয়; প্রতিটি ক্ষেত্রেই কাজ শুরু হয়েছে। খেয়াল করুন, অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসনে সংস্কার আনার জন্য, জনপ্রশাসনকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ করার জন্য কমিশন করে দিয়েছে। কাজেই সরকারের অংশ হিসেবে আমারও দায়িত্ব আমার অধীনের দুটি মন্ত্রণালয়ে যেসব আমলা কাজ করছেন, তারা যেন নিরপেক্ষ-স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। একই সঙ্গে যেন স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করেন।

আরও